বদলির আদেশ গায়েব করে চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তেই বহাল ‘ভালো হয়ে যাও খ্যাত ভাইরাল মাসুদ’
বিশেষ প্রতিনিধি :
আদেশ জারি হলো, অথচ কার্যকর হওয়ার আগেই রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে গেল নথি! বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ে বদলি করা হলেও শেষ পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছেন তিনি। বহুল আলোচিত এই কর্মকর্তার বদলির আদেশ হুট করে বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও ধোঁয়াশা। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত রাতারাতি বদলে গেল? চট্টগ্রাম কি তবে কিছু কর্মকর্তার জন্য কেবলই ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’?
কে এই ‘ভাইরাল মাসুদ’?
বিআরটিএ-র ইঞ্জিনিয়ারিং উইংয়ের এই বিতর্কিত কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলমকে নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরনো। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ ও দ্রুততম সময়ে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া কিংবা টাকা নিয়েও দিনের পর দিন মানুষকে ঘোরানো ছিল তার দাপ্তরিক চর্চা।
তার এই লাগামহীন অনিয়মের প্রেক্ষিতেই একসময় তৎকালিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরাসরি তাকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “মাসুদ, তুমি ভালো হয়ে যাও।” মন্ত্রীদের এই ডায়লগ সেসময় নেটদুনিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হলেও বাস্তবে মাসুদের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
নথিপত্র যা বলছে
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ৭ মার্চ বিআরটিএর এক অফিস আদেশে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পদে বদলি করা হয়। একই আদেশে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
তবে আদেশ জারির পরপরই অলৌকিকভাবে থেমে যায় এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। কোনো রকম দাপ্তরিক ব্যাখ্যা কিংবা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ফাইলবন্দী ও বাতিল হয়ে যায় সেই সিদ্ধান্ত। ফলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রভাবশালী চেয়ারে আগের মতোই বহাল থেকে যান মাসুদ আলম।
সেবাবঞ্চিত ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে আসা সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশীদের দুর্ভোগ দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করেছে। বদলির আদেশ ভেস্তে যাওয়ার পর কার্যালয়টিতে সিন্ডিকেট ও দালালচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য:
কফিল উদ্দিন (ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশী): “গত আট মাস ধরে লাইসেন্সের জন্য ঘুরছি। একের পর এক অহেতুক ভুল ধরে আটকে রাখা হচ্ছে। অথচ দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দিলে নাকি এক সপ্তাহেই কাজ হয়। পরিচালকের বদলির খবর শুনে ভেবেছিলাম অনিয়ম কমবে, কিন্তু তিনি তো বহাল তবিয়তেই আছেন।”
মোহাম্মদ জসিম (মালিক, সিএনজি অটোরিকশা): “মালিকানা বদল আর ফিটনেস সনদের জন্য বিআরটিএ-তে গেলে সরাসরি হয়রানির শিকার হতে হয়। এখানে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। বদলির আদেশ কীভাবে গায়েব হয়ে যায়, তা বুঝে আসে না। মনে হচ্ছে পুরো অফিসটাই এখন সিন্ডিকেটের দখলে।”
অলৌকিক ‘উধাও’ ও বিআরটিএ-র নীরবতা
বিআরটিএ-র একাধিক সূত্র জানায়, মাসুদ আলমের বদলির আদেশ বাতিলের পেছনে বড় অঙ্কের লেনদেন এবং একটি প্রভাবশালী মহলের তদবির কাজ করেছে। মন্ত্রী স্বয়ং সতর্ক করার পরও যিনি ‘ভালো হননি’, সেই কর্মকর্তা কীভাবে প্রশাসনিক বদলি আটকে একই স্থানে পদ আঁকড়ে থাকেন—তা নিয়ে খোদ দপ্তরের ভেতরেই চলছে তোলপাড়। সাধারণ মানুষের মন্তব্য, মাসুদরা ভালো হয়নি এবং হবেও না; যুগে যুগে এমন ‘মাসুদ’রাই পুরো সংস্থাকে জিম্মি করে রাখবে।
বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা:
রহস্যজনক বদলি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বিআরটিএ-র নানাবিধ অনিয়মের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালানো হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
Leave a Reply