চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পলাতক রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ন্ত্রক দপ্তরের শিপিং শাখার কর্মচারী মো. হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করে যাচ্ছেন। এ প্রতারণায় তার স্ত্রীও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে পোর্টার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীরা জানান, মো. হোসেন পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে মেটারিয়াল চেকার (শিপিং) পদে কর্মরত। তিনি নিজেকে রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বিশ্বস্ত কর্মচারী পরিচয় দিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে এলাকার শত শত বেকার তরুণ-তরুণীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করেন। এ কাজে তার স্ত্রী সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে (সম্মান রক্ষার্থে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি)।
চাকরি দিতে বিলম্ব হওয়ায় একপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হলে তারা প্রায়ই দপ্তরে গিয়ে মো. হোসেনের খোঁজ করতে থাকেন। এরই মধ্যে এক তরুণী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে এসে খোঁজ নেয়। এর পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যান মো. হোসেন।
ভুক্তভোগী আমিরুল ইসলাম জানান, তিন বছর আগে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মো. হোসেন তার কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেন। ওই টাকা জোগাড় করতে তাকে বাবার জমি বিক্রি করতে হয়। চাকরি না হওয়ায় পরিবার থেকেও তিনি বিতাড়িত হন। এ বিষয়ে দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাকে জানালেও কোনো সমাধান পাননি। তার অভিযোগ, এই প্রতারণার সঙ্গে দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।
আরেক ভুক্তভোগী এক নারী জানান, তিনি একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী। চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের প্রমাণও তার কাছে রয়েছে। তিনি প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্তের জন্য সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (শিপিং)–কে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই তদন্ত এখনো ঝুলে রয়েছে।
সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের তথ্যমতে, মো. হোসেন ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় চার মাস কোনো কারণ ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। বিস্ময়করভাবে এই সময়ে তিনি প্রতিমাসেই বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের এসএসএই মনিরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এলইপি ছুটিতে ছয় মাসের সুযোগ রয়েছে, তবে এর জন্য আবেদন করতে হয়। যেহেতু মো. হোসেন কোনো আবেদন করেননি, তাই পরবর্তী সময়ে তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (শিপিং) আসিফুল ইসলাম বলেন, কীভাবে তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন, তা তার জানা নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে শিপিং দপ্তরের এসএসএই সাইফুল ইসলাম–কে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এসএসএই সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয়ের সাথেই কথা বলা হয়েছে। মো. হোসেন টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করলেও তা চাকরির বিনিময়ে নয় বলে দাবি করেছেন। বিষয়টি জটিল হওয়ায় উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা দ্বারা তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি লেখেন, “ঢাকায় আছি ভাই, একটু ঝামেলায় আছি”—এরপর আর কোনো সাড়া দেননি।
Leave a Reply